হঠাৎ সামনে এসে পড়ে বাঘ, কুড়ালই ছিল কওসারের শেষ ভরসা

হঠাৎ সামনে এসে পড়ে বাঘ, কুড়ালই ছিল কওসারের শেষ ভরসা

জানুয়ারী 12, 2026 - 10:36
 0  5
হঠাৎ সামনে এসে পড়ে বাঘ, কুড়ালই ছিল কওসারের শেষ ভরসা

খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা গোলখালী গ্রামে কওসার গাইনের বাড়ি। এই গ্রামে জন্মালে জীবনের সঙ্গে সুন্দরবনের সম্পর্ক আপনাতেই গড়ে ওঠে। কারও জীবিকা মাছ ধরা, কারও কাঁকড়া শিকার, আবার মৌসুম এলে কেউ কেউ যান মধু সংগ্রহে।

কওসারও এর ব্যতিক্রম নন। কখনো জেলে, কখনো কাঁকড়া শিকারি, আবার কখনো মৌয়াল—জীবনের তাগিদেই সুন্দরবনের সঙ্গে তাঁর এই বহুমুখী সম্পর্ক।

এই সুন্দরবনেই কওসার একদিন হারিয়েছেন তাঁর বড় ভাই অমেদ আলী গাইনকে। মাছ ধরার সময় নদীর তীর ধরে জাল টানছিলেন অমেদ। হঠাৎ বনের ভেতর থেকে লাফিয়ে পড়ে একটি বাঘ। জালসহ তাঁকে চেপে ধরে মুহূর্তের মধ্যেই টেনে নিয়ে যায় বনের গহিনে।

কওসার তখন একটু দূরে ছিলেন। কাছে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ। শরীরের কিছু অংশ খেয়েছিল বাঘ, বাকি অংশ ছিল অক্ষত। কওসার গাইন নিজেই বড় ভাইয়ের লাশ কাঁধে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

শনিবার দুপুরে সুন্দরবন–সংলগ্ন আড়পাঙ্গাসিয়া নদীর চরে রাখা একটি নৌকায় বসে কওসার গাইনের সঙ্গে কথা হয়। নৌকার ভেতরে তখন মাছ ধরার জাল, হাঁড়ি-পাতিল আর শুকনো খাবার গুছিয়ে রাখার ব্যস্ততা। সন্ধ্যার জোয়ারে নৌকা ছাড়বে সুন্দরবনের পথে। কাজের ফাঁকেই শুরু হয় গল্প—জীবন, জীবিকা আর বাঘের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে।

ষাটোর্ধ্ব কওসার গাইন বলেন, ‘বাঘের ভয় পাইয়ে ঘরে বইসে থাকলি তো পেট চলবি না। একটুও জমিজমা নেই। সুন্দরবন থেইকেই মাছ, কাঁকড়া আর মধু আইনে সংসার চালাতি হয়। প্রায় ৩৫ বছর ধইরে সুন্দরবনে যাতায়াত করতিছি। এই পর্যন্ত চারবার বাঘ দেখিছি। বেশির ভাগ সময় দূর থেইকেই। কিন্তু সাত বছর আগে একবার এক্কেবারে সামনে পড়িছিলাম।’

সেই কথা বলতে গিয়ে কওসার বলেন, সেবার তাঁরা আটজন মৌয়াল মিলে মধু কাটতে গিয়েছিলেন। বনের ভেতর হেঁটে হেঁটে মৌচাক খোঁজাকে মৌয়ালদের ভাষায় বলা হয় ‘ছাটা দেওয়া’। সবাই কিছুটা দূরত্ব রেখে হাঁটছিলেন। কওসারের পাশেই ছিল হেতাল গাছের ঝোপ। হঠাৎ সেই ঝোপের ভেতর থেকে হুংকার দিয়ে ঝাঁপিয়ে সামনে এসে পড়ে এক বিশাল বাঘ।

কওসারের হাতে তখন একটি কুড়াল। মুহূর্তের মধ্যে কুড়াল তুলে বাঘের দিকে কোপ দেন তিনি। বাঘ এক পা পিছিয়ে যাওয়ায় কুড়াল পড়ে মাটিতে। বাঘের এই আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। সাধারণত বাঘ ধীরে, লুকিয়ে, ওত পেতে আক্রমণ করে। কওসারের ধারণা, বাঘটি বনের ভেতর শুয়ে ছিল। চারদিক থেকে মানুষের চলাচল দেখে দিশেহারা হয়ে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

কওসার গাইন বলেন, ‘মৃত্যুর মুখি দাঁড়ায়ে তখন কুড়ালই আমার শেষ ভরসা। একেক ঝুঁকিতে বাঘ এক-দুই ফুট করে আগায়ে আসে, আবার খানিকটা পিছায়ে যায়। গোঙানি আর গর্জনে বনডা থরথর কইরে কাঁপতিছিল। এত কাছে ছিল যে বাঘের মুখের লালা ছিটকে আইসে আমার গায়ে পড়তিছিল।’

একপর্যায়ে বাঘ রাগে সামনের দুই পা দিয়ে মাটি আঁচড়াতে থাকে। কওসারের চিৎকারে সঙ্গীরা বুঝতে পেরে গাছের গায়ে বাড়ি দিতে দিতে এগিয়ে আসেন। চারপাশের শব্দ আর মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে বাঘটি বড় একটি লাফ দিয়ে পিছিয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় বনের ভেতর।

কওসার গাইন বলেন, ‘আল্লাহ হায়াত রাখিছিলেন বইলেই সেদিন বাঘের মুখ থেইকে ফিরি আসতি পারিলাম। বাঘটা ছিল বিশাল এক পুরুষ বাঘ। মানুষ বলে বাঘের চার চোখ—সেদিন আমার কাছে সত্যিই চার চোখওয়ালা বাঘই মনে হইছিল। যেভাবে ভ্রু কুঁচকে দুই হিংস্র চোখে তাকাইছিল, সেইটি আজও ভুলতি পারিনে।’

কথা শেষ করে আবার নৌকার কাজে মন দেন কওসার গাইন। রাতের জোয়ারে নৌকা ছাড়বে সুন্দরবনের পথে। এবার মাছ ধরতে যাচ্ছেন তিনি। বাঘের ভয়, মৃত্যুর স্মৃতি—সবকিছুকে সঙ্গী করেই আবারও তাঁর যাত্রা সুন্দরবনের দিকে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

পছন্দ করুন পছন্দ করুন 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
গোস্বামী গোস্বামী 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
বাহ! বাহ! 0
Md. Firoj Uddin As a passionate news reporter, I am fueled by an insatiable curiosity and an unwavering commitment to truth. With a keen eye for detail and a relentless pursuit of stories, I strive to deliver timely and accurate information that empowers and engages readers.